বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি দেশটিকে এখন জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। কারণ, দেশের বেশিরভাগ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া এবং টিকাদানে ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
সারা দেশে দ্রুত ছড়াচ্ছে সংক্রমণ
দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে—যা মোট জেলার প্রায় ৯১ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে, আর মার্চ-এপ্রিল সময়ে তা স্পষ্টভাবে তীব্র আকার নেয়।
১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯০০ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা
হামে আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু, বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই এই বয়সসীমার। দুই বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক শিশু আবার টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমিত হচ্ছে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ঢাকা বিভাগে বেশি প্রভাব
সংক্রমণের চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিভাগ–এ। ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি। এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া গেছে।
কেন বাড়ছে সংক্রমণ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতিই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ। আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকার সরবরাহ ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন এবং সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না থাকায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে।
এর ফলে বড় একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
হামের বৈশিষ্ট্য ও ঝুঁকি
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাস ও ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের ১০–১৪ দিনের মধ্যে জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
যদিও অনেক ক্ষেত্রে রোগটি নিজে থেকেই সেরে যায়, তবে জটিলতা মারাত্মক হতে পারে—যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), এমনকি মৃত্যু।
সীমান্ত ও নগরকেন্দ্র বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো বড় শহর আন্তর্জাতিক যাতায়াতের কেন্দ্র হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় পারাপারের মাধ্যমে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
করণীয় কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিয়ে বলছে—
- হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে
- দ্রুত রোগ শনাক্ত ও নজরদারি জোরদার করতে হবে
- সীমান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন
- হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে শিশু ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।