রূপান্তর রূপ ।। রোহিঙ্গাদের আবারও ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে মিয়ানমার সরকার। দেশটির সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে এমন অবস্থান প্রকাশের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা যখন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই কেন এই পুরোনো বিতর্ক সামনে আনল মিয়ানমার? এর মাধ্যমে কি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে?
বাংলাদেশ বলছে, রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের বক্তব্যের সঙ্গে তারা একমত নয়। বরং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকার এবং রাখাইনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আরাকান আর্মির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আছে। ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই—এমন অবস্থান দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিয়ে আসছে। নতুন বিবৃতিতে সেই অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর ব্যাপক অভিযান ও সহিংসতার পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ও পরেও বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে মিলিয়ে তাদের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। মিয়ানমার সরকারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশে থাকা তিন লাখের কিছু বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে ফেরত নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাদের। দেশটি দাবি করেছে, রাখাইন থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের হিসাবে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা দেশটিতে আশ্রয় নিয়ে আছে।
মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একপেশে ও ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো স্বীকৃত জাতিগত পরিচয় মিয়ানমারে নেই। বরং বাংলাদেশে থাকা মানুষদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে দেশটি। মিয়ানমারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সহিংসতার আগে বুথিডং, মংডু ও রাথিডং এলাকায় সাত লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। তাদের দাবি, সহিংসতার পর পাঁচ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায় এবং দুই লাখের বেশি সেখানে থেকে যায়।
প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ যে আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা দিয়েছিল, তার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির দাবি, যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। চার হাজার ২৪১ জনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে। মিয়ানমার বলছে, যাচাই হওয়া বাস্তুচ্যুতদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে তারা কাজ করছে। তবে বাস্তবে প্রত্যাবাসন নিয়ে এর আগেও একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
২০১৮ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না থাকায় তারা ফিরতে রাজি হয়নি। পরের বছর চীনের উদ্যোগেও প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সেটিও সফল হয়নি। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দেয়। এরপর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে বহু আলোচনা হয়েছে। চীনও বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় কোনো উদ্যোগই বাস্তব ফল দেয়নি।
সাম্প্রতিক বিবৃতির পর ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৈঠকে মিয়ানমারের বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের বক্তব্যের সঙ্গে ঢাকা একমত নয়। তার ভাষায়, রোহিঙ্গাদের নিজস্ব পরিচয় রয়েছে এবং সেই পরিচয় নিয়েই তাদের দেশে ফিরতে হবে। তিনি জানান, প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় চীনও বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগে তারা ভূমিকা রাখবে।
মিয়ানমারের নতুন ‘বাঙালি’ বিতর্ক রোহিঙ্গা সংকটের পুরোনো প্রশ্নকেই সামনে এনেছে—রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার আসলেই কতটা প্রস্তুত? রাখাইনের পরিবর্তিত বাস্তবতা, মিয়ানমার সরকারের অবস্থান এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু মিলিয়ে প্রত্যাবাসনের পথ যে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, তা বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। এখন আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ এই জটিলতা কতটা কাটাতে পারে, সেটিই বড় প্রশ্ন।