রূপান্তর রূপ ।। প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল ‘রিং অব ফায়ার’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলায় শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় প্রশ্ন উঠেছে—প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূকম্পন বলয় কি নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে?
তবে ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ভূমিকম্প ভয়াবহ হলেও এগুলোকে ‘রিং অব ফায়ার’জুড়ে অস্বাভাবিক সক্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে শনিবার ভোরে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। স্থানীয় সময় সকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে কম্পনটি শুরু হয়। এর কেন্দ্র ছিল পূর্ব নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের এন্ডে শহর থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে।
ভূমিকম্পে অন্তত ৫১ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ধসে পড়েছে দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা। প্রায় ২ হাজার মানুষকে সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব উপকূলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। রিউং এলাকায় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৬১ মিটার এবং এন্ডে রেসিডেন্সির মাউরোলে প্রায় ৯৪ সেন্টিমিটার উচ্চতার ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রথম ভূমিকম্পের পর অন্তত ২৩৫টি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ২।
দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত
ভূমিকম্পের প্রভাবে ভূমিধসের পাশাপাশি বেশ কিছু এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে ফ্লোরেসের নাগেকিওসহ দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম কঠিন হয়ে উঠেছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন। তবে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্লোরেস অঞ্চলে ভূমিকম্পের ইতিহাসও ভয়াবহ। ১৯৯২ সালে একই অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
কেন ইন্দোনেশিয়ায় এত ভূমিকম্প?
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে ঘোড়ার খুরের মতো বিস্তৃত এই অঞ্চলে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ ঘটে।
এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘সাবডাকশন’। অর্থাৎ একটি টেকটোনিক প্লেট অন্য একটি প্লেটের নিচে ঢুকে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ভূগর্ভে বিপুল চাপ ও শক্তি জমা হয়। সেই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে সৃষ্টি হয় শক্তিশালী ভূমিকম্প। একই কারণে এই অঞ্চলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও বেশি ঘটে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর প্রায় ৮১ শতাংশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূকম্পন বলয়ে ঘটে।
কলম্বিয়াতেও ভয়াবহ ভূমিকম্প
ইন্দোনেশিয়ার বিপর্যয়ের কয়েক দিন আগে পশ্চিম কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। চলতি শতাব্দীতে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি এটি।
ভূমিকম্পে ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
তবে কলম্বিয়ার ভূমিকম্পের ধরন ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকম্পের চেয়ে ভিন্ন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, এটি ছিল ‘স্ট্রাইক-স্লিপ’ ধরনের ভূমিকম্প। এ ক্ষেত্রে টেকটোনিক প্লেটগুলো একে অপরের বিপরীত দিকে অনুভূমিকভাবে সরে যাওয়ার সময় সঞ্চিত শক্তি মুক্ত হয়।
ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প
এর আগে গত জুনে ভেনিজুয়েলায় মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।
ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
তাহলে কি ‘রিং অব ফায়ার’ সক্রিয় হচ্ছে?
ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলায় অল্প সময়ের ব্যবধানে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রিং অব ফায়ার’ নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠার আলোচনা চলছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক দেশে কাছাকাছি সময়ে ভূমিকম্প হওয়া মানেই পুরো রিং অব ফায়ার একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
একটি বড় ভূমিকম্প স্থানীয়ভাবে পরবর্তী পরাঘাত সৃষ্টি করতে পারে এবং কাছাকাছি ফল্টে চাপের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের আলাদা ভূমিকম্পকে একটি একক ভূকম্পন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভয়াবহ হলেও এগুলোকে এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক কার্যক্রম হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কোন কোন দেশ ঝুঁকিতে?
‘রিং অব ফায়ার’ ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি জাপান, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকাকে ঘিরে রয়েছে।
জাপানের তোহুকুতে ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামি এই অঞ্চলের ঝুঁকির বড় উদাহরণ। ১৯৬৪ সালে আলাস্কায় ৯ দশমিক ২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পও এই ভূকম্পন বলয়ের ভয়াবহতার প্রমাণ।
দক্ষিণ আমেরিকায় নাজকা প্লেটের নিচে অন্য প্লেটের প্রবেশের কারণে আন্দিজ অঞ্চলেও প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটে।
ভূমিকম্প কেন থামানো যায় না?
পৃথিবীর শক্ত বাইরের আবরণ একটিমাত্র খণ্ড নয়। এটি বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট সবসময় ধীরে ধীরে নড়াচড়া করছে।
কোথাও প্লেট একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে, কোথাও একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যাচ্ছে, আবার কোথাও পাশাপাশি বিপরীত দিকে সরে যাচ্ছে। এই চলাচলের সময় ভূগর্ভে বিপুল শক্তি জমা হয়। কোনো এক পর্যায়ে সেই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
তাই ‘রিং অব ফায়ার’-এ ভূমিকম্প নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠনই একে বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি অঞ্চলগুলোর একটি করে তুলেছে।
সামনে কি বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অবশ্যই সতর্কতার কারণ। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে—এটি বিজ্ঞানীরা এখনো নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দিতে পারেন না।
ফলে ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ফিলিপাইনসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো, দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, সুনামি প্রস্তুতি এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো ‘রিং অব ফায়ার’কে আলোচনায় ফিরিয়ে আনলেও এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, পুরো ভূকম্পন বলয় অস্বাভাবিকভাবে জেগে উঠেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জেগে উঠছে কি রিং অব ফায়ার?
7