ইসরায়েলের সমর্থনে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখন কৌশলগত ও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। তেহরানের ভাষ্য, এই সংঘাতে জড়িয়ে ওয়াশিংটন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে সহজে বেরিয়ে আসার পথ নেই। একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে কার্যকর বিকল্প ততই সীমিত হয়ে পড়ছে।
রোববার ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, কূটনীতিকে সুযোগ করে দিতে আপাতত ইরানে বিমান হামলা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সিএনএনের মতে, আলোচনার কিছু ইঙ্গিত মিললেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান এখনো নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি। ফলে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু পাঁচ মাস পার হলেও পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। তেলের দাম, গ্যাসের বাজার, লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথের অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন জনগণের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এখন হোয়াইট হাউসের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো নতুন করে সামরিক হামলা বা স্থল অভিযান। তবে এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি যুদ্ধের ব্যয়ও আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বদলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও এ পথ নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
দ্বিতীয় বিকল্প হলো আরও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ। বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে লক্ষ্য করে চাপ বাড়ানো হলে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে। তবে এ ধরনের কৌশল কার্যকর করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সিএনএনের মতে, এমন দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মতো রাজনৈতিক ধৈর্য ও জনসমর্থন ট্রাম্পের হাতে খুব বেশি নেই।
তৃতীয় পথ হতে পারে ইরানের সঙ্গে আগের সমঝোতা চুক্তিতে ফিরে যাওয়া। কিন্তু হরমুজ প্রণালি ও নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাড় না পেলে তেহরান সেই পথে হাঁটবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যদি ছাড় দেয়, তাহলে তা ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে।
এদিকে, ইরানে হামলা বন্ধের পেছনে অস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে—এমন গুঞ্জনও নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে কোনো সংকট নেই এবং বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় তাদের সামরিক সক্ষমতা বেশি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন সফরে গেছেন। দুই নেতার বৈঠকে ইরান যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় গ্রেপ্তার করা হবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন ট্রাম্প।
যুদ্ধ থামাতে কূটনীতি, সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে ওয়াশিংটন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে এমন কোনো সহজ সমাধান নেই, যা একই সঙ্গে দ্রুত, কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে লাভজনক।